Anuja Dutta

বেশ কিছু হপ্তা আগে আমি ও আমার এক জনৈক বন্ধু খুব ক্ষিপ্রতার সাথে সিদ্ধান্ত নিই যে একটু রোমাঞ্চকর কিছু করতে হবে, এমন কোনো অ্যাডভেঞ্চার যার জন্য পরবর্তীকালে দুষলে কেবল দুষবো নিজেদেরই। অর্থাৎ, ফুল অ্যাকাউন্টিবিলিটির সাথে অগাচণ্ডীর ন্যায় কোনো কাজ করা। গেলুম মৈনাক ভৌমিকের বাৎসরিক দেখতে। মাল্টিপ্লেক্সে ৩০০ টাকা নুন শো টিকিটের জমানায় ৩০ টাকার স্বল্প মাশুলের বিনিময়ে খুবই নির্দোষ আমোদ, সন্দেহ নেই।
নন্দন চত্বরে ভূতের ছবি। বাইরে প্যাচপ্যাচে গরমের মধ্যে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। সর্ষের তেলে ভাজা একটা পপকর্নের প্যাকেট ব্যাগে সাঁট করে লুকিয়ে নিয়ে সুদীর্ঘ লাইন পেরিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যেই না একটু আঁটোসাঁটো হয়ে বসেছি, অমনি বেবাক সিনেমা চালু হয়ে গেলো। প্রথম দৃশ্যেই চমক। স্টিয়ারিং হুইলে মাথা ঠুকে সদ্য মরে যাওয়া বর হঠাৎ প্রেতযোনি প্রাপ্ত হয়ে সাদা চোখ বার করে ঘ্যাঁক করে উঠলো পাশের সিট অকুপাই করে থাকা বউয়ের দিকে, অর্থাৎ দর্শকের দিকে। আমি আর বন্ধু খানিক চোখ পিটপিট করলাম। ভাবখানা এমন, যেন, হুঁহুঁ বাওয়া, সবে তো শুরু। বরের বাৎসরিক পূর্ণ হতে আরো এক বছর।
হরর নিয়ে দুর্বলতা আমার আজকের নয়। সেই মাস্টার্সের সময় থেকে। ক্রোনেনবার্গ, কারপেন্টার, স্যাম রাইমি, সত্যজিৎ, বার্টন, ব্লামহাউস, শাডার, হিচকক, অ্যারি অ্যাস্টার, ফ্ল্যানাগান, শ্যামালান, তরুন মজুমদার থেকে তারানাথ—সবই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ছাপ ফেলেছে। এহেন ‘উচ্চমার্গের’ হরর এনথুজিয়াস্টকে যখন বন্ধু হালফিলের বাংলা সিনেমার উদ্দেশ্যে ব্রতী করতে চায়, তখন হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তাই ভরসা করে হল্-এর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়তে হয়, অতো বাছবিচার করলে চলে না। অগত্যা, বাৎসরিক।

ভাইকে হারিয়ে ঝানু (অভি)নেত্রী শতাব্দী রায় শোকে ববছাঁট চুল দুলিয়ে দুলিয়ে কেমন ফুচকা খায় আর টুকটাক তন্ত্রমন্ত্রে হাত পাকায়, এবং সহঅভিনেত্রী ঋতাভরী চক্কোত্তি ভৌতিক উপদ্রবের শিকার হতে হতে মোট কীভাবে নিজের ননদকে কচুকাটা করার তাল করে তাই নিয়েই মোট গপ্প।
এক জাম্পস্কেয়ার দৃশ্যে সামনের সারিতে বসা এক দর্শক হঠাৎ ‘অ্যাঁ!’ বলে ট্যাঁ-ফোঁ করে উঠলেন; আমরা ভাবলাম কী হলো রে বাবা। পপকর্নের বাসি সর্ষের তেল প্যান্টে মুছতে মুছতে আমি আর বন্ধু তখন নাকমুখ খিঁচিয়ে ভূতভাবন মন্ত্র আওড়াচ্ছি, এমন সময় কোত্থেকে শতাব্দী মাসি কাঁসার ঘট-টট এনে ওঁ নমঃ ওঁ নমঃ ওঁ নমঃ বলে ভূতেদের একেবারে রামকাঁদান কাঁদিয়ে ছাড়লে। অতএব? যবনিকা, পাত। অশরীরী? কুপোকাত। ননদ-বৌ জুটি? কিস্তিমাৎ!
বাৎসরিক ‘ব্যাড আর্ট’ সন্দেহ নেই। তাতে আসছি খানিক বাদে। তার আগে অন্য এক প্রসঙ্গে আসি। হরর-এ ‘বি-গ্রেড’ বা পাল্প জাতিয় বিষয়বস্তু ঐতিহাসিকভাবে সবসময় সাড়া না ফেললেও, ইতিহাসের কিছু স্তরে বা কিছু বিশেষ চেতনামনস্ক সমষ্টি, শ্রেণী, বা মানুষের কাছে অনেকসময় অনেকখানি জনপ্রিয়তা অর্জন করে ফেলে। চলচ্চিত্রের বড় ক্যানভাসে তাদের নিয়ে স্বভাবতই সেইভাবে মাতামাতি বা পর্যালোচনা হয় না কারণ তারা বৃহৎ কোনো বাণিজ্যিক ‘বেস’-কে হয়তো রিপ্রেসেন্ট করে না, কিন্তু এই মুষ্টিমেয় জনপ্রিয়তাই অনেক সময় টিঁকে যায় যুগ যুগ ধরে। A cultural reproduction of selective taste. খুব মনে পড়ছে জন কারপেন্টারের ডার্ক স্টার বা স্যাম রাইমির ইভিল ডেড ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রথম দিকের অখ্যাতনামা কাজগুলি, যা হয়তো আজকের দিনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও পরিকাঠামোর যুগে ঝাঁ-চকচকে হরর সিনেমার মতো ধাঁই ধাঁই করে বক্স অফিস ক্র্যাশ করবে না, কিন্তু কোথাও গিয়ে ওই অত্যন্ত নিম্নমানের কাজগুলোও আজ দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ ‘দুর্বল কাজের’ ইউনিভার্সে।


না, মার্কিনি হলিউড বা অন্যান্য রিজিওনাল লো-বাজেট ক্রিয়েটিভ এন্টারপ্রাইজের চোখে আমি বর্তমান টলিউড ইন্ডাস্ট্রির কাজের সূক্ষ্মতা বা মূল্যায়ন একেবারেই করছি না, কারন সেটা করা অন্যায়। বিষয়টি যেহেতু ‘ব্যাড আর্ট’, আমি কেবল ভাবছি তথাকথিত খারাপ কাজ কেবল ‘খারাপ’ হিসেবেই সাফল্য লাভ করে কীভাবে। তার মানে কি গল্প বা স্টোরিলাইন একেবারে আঁটোসাঁটো ছিল? ক্যামেরার কাজ ঝুল হলেও দেখানোর দৃষ্টিভঙ্গি কি সৎ ছিল? সিনেমার বিষয়বস্তু (চলতি ভাষায় যাকে ‘কন্টেন্ট’ বলে) দর্শকদের থেকে যা emotional outcome আশা করেছিলো, তার আন্দাজ কি তবে নির্দেশকের নির্ভুল ছিল? তাই বুঝি কমার্শিয়াল ফ্লপ হয়েও স্মৃতির ঘোড়দৌড়ে সে জিতে গেছে? এগুলো ফটকা মাত্র। পাঠক যেন ভেবে নেবেন না এর সুযোগ্য উত্তর আমার কাছে আছে। রাইমির উল্লিখিত ছবিতে অরেঞ্জ জুসের রঙের ফোয়ারার মতো রক্তপাত, বা মুখের সামনে লম্বা-গলা বিকৃত করোটির নাচ দেখে আমার বত্রিশ নাড়ি পাক দিলেও সিনেমাটা শেষ অব্দি শেষ করেছিলাম। মনে হয়তো সেই স্থূল দৃশ্য খানিক ঘৃণার উদ্রেক করেছিল, নন্দনতত্বের ভাষায় যাকে ‘গ্রোটেক্স’ বলে। অনুভূতিটা মধুর ছিল না মোটেও। ভয়ের লেশমাত্র না থাকার কারণেই হোক, বা ধৈর্যচ্যুতির কারণেই হোক, প্রায়শই হেসে উঠছিলাম এ-কথাও বেশ মনে আছে। তার মানে কি কদর্য শিল্প উপভোগ করেছি একটু হলেও? হতেও পারে।

বর্তমানে বাংলা ভৌতিক বা ভয়কেন্দ্রিক ছবি যা দেখে মহা আনন্দ পেয়েছিলাম তা নির্দ্বিধায় বল্লভপুরের রূপকথা। সেও এক বন্ধুর সঙ্গে ভরদুপুরে সস্তার সিনেমা হল-এ গিয়ে। দুজনেই মহা হেসেছি। কখনও খ্যাঁকখেঁকিয়ে, কখনও মুচকি, কখনও স্মিত, কখনও অট্টহাস্য। এই এতরকমের হাসি যে পরিচালক আমার থেকে আদায় করে নিলেন, তাতে কোনো চালাকি ছিল না। ছিল হাসাতে পারার দক্ষতা, এবং দর্শকের তরফে মুহুর্মুহু কন্সেন্ট; জোর করে বা কাতুকুতু দিয়ে হাসানো নয়।
ফিরে আসি বাৎসরিক-এ। কথা উঠতে পারে এই সিনেমাও তো আমায় (ও এই ম্যাগাজিনের প্রধান সম্পাদককে) পিলে চমকিয়ে হাসিয়েছে। তাহলে আমি খারাপ শিল্পের পর্যালোচনায় তাকে ফেললাম কেন? কিছু সঙ্গত কারণ অবশ্যই অভিনয়ের ‘অ’ না খুঁজে পাওয়া, বাঙালির চিরাচরিত রাবীন্দ্রিক চেতনায় সুড়সুড়ি দিয়ে অত্যন্ত হাস্যকর ও ভুলভাল গানের প্রয়োগ, গল্পের গরুকে পর্যাপ্ত পরিমাণ জাবনা না দিয়েই তার থেকে সেরেল্যাকের ন্যায় সুমিষ্ট দুধ আশা করা, ও ভৌতিক আমেজ তৈরি করতে গিয়ে একটি ভৌতিক বিপর্যয় ঘটিয়ে ফেলা যেখানে ভূতে-মানুষে মিলে এমন এক বকচ্ছপ মূর্তি তৈরি হয়েছে যাকে নবরসের কোন রসে চোবাবো বোঝা দুষ্কর। ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’-ই সেখানে একমাত্র emotional outcome। কেউ ঘ্যাঁক করে উঠতেই পারেন, ‘এতই বিজ্ঞ যখন তখন সিনেমা দেখতে যাও কেন? এসে তার গুষ্টি উদ্ধার করবে বলে? একটা ভূতের সিনেমা বানানো কি ইয়ে, নাকি!’ মহা মুশকিল। আচ্ছা বলুন তো, বাংলায় চৌত্রিশ বছরের বাম অপশাসনকে খিস্তোনোর জন্য কি নিজেকেও তাহলে পার্টির খাতায় আগে নাম লেখাতে হবে?
আসলে, যেচে হতাশ হওয়ার মধ্যেও এক ব্যাঁকা আনন্দ কাজ করে। আমি যা যা আঁচ করে একটা প্রেক্ষাগৃহে প্রবেশ করছি, ঠিক তাই তাই ফলে গেলে এক ফচকে উল্লাস হয়। পরিচালককে সেখানে নিজের শৈল্পিক দায়বদ্ধতা থেকে একরকম মুক্তি দেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে আমরা অপেক্ষা করে থাকি না কখন পরিচালক আমাদের চমকে দেবেন বা অবাক করবেন, বরং তার থেকে যা প্রত্যাশিত, সেটা গ্রহণ বা খারিজ করতে করতেই দর্শক হিসেবে আমাদের দায় ফুরিয়ে যায়। দু-ঘন্টা ধরে সিনেমায় মনোনিবেশ করেও হাতিঘোড়া কিছু না পাওয়ার যে সুপরিকল্পনা, তিতিবিরক্ত হয়ে গিয়েও ‘শেষ দেখে ছাড়বো’র যে জেদ – এটাই হয়তো একটা খারাপ বা ওঁচা কাজের ক্রিয়া। আঁতকে উঠিয়েও আটকে রাখা।
এ তো গেলো হতাশাপূর্ণ বিদ্রূপের আনন্দ। কিন্তু যেই জিনিস তথাকথিত ভাবে নিকৃষ্ট হয়েও আনাবিল আনন্দ দেয়, তাকে আলাদা করবো কীভাবে? সিনেমার উদাহরণ ছেড়ে কিছু বিশেষ গানের প্রসঙ্গে আসি। বছরখানেক আগে একটি গান খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। অভিষেক সাহা ও আরব দে চৌধুরীর টুম্পা। এগুলো যাকে বলে ‘মাচা’ গান, উচ্চাঙ্গ সঙ্গিতের বিপরীত মেরুতে যার অবস্থান। অর্থাৎ মাচা বেঁধে বুম্বক্স বাজিয়ে যে গানের সাথে পাড়ার নবীন-প্রবীণ মিলিয়ে অনায়াসে কোমর দোলানো যায়। গানের লিরিক্স বাঁধিয়ে রাখার মতো সহজ। সারমর্ম এই: সদ্যবিবাহিত বৌ-হারা এক যুবক, ফুলশয্যা পেরোতেই বৌ যাকে ছেড়ে পালিয়েছে, তিনি সেই দুঃখ ভুলে জনৈক ‘টুম্পা’র প্রেমে এখন বিভোর। টুম্পা তার কাছে ছেলেখেলার বস্তু নন, তাকে তিনি আদর করে “পুঁচকি সোনা” বলে ডাকেন, তাকে দস্তুরমত বিয়ে করতে আগ্রহী, মায় দীঘা পর্যন্ত হানিমুনও প্ল্যান করে নিয়েছেন।

গানটি শুনেই বোঝা যায় খুব সচেতনভাবেই তাকে পরিশীলিত করে তোলার কোনো চেষ্টা নেই; উচ্চারণে ‘s’-এর প্রাধান্য, হিন্দি-বাংলা মিশিয়ে একটা ইচ্ছাকৃত দোআঁশলা ভাব, গানের ভাষায় অমার্জিত শব্দের ব্যবহার না হলেও সামগ্রিকভাবে একটা ‘অসংস্কৃত’ বা ‘ক্যাজড়া’ ভঙ্গিমার চলন—এ সকলই হয়তো মাচা গানের বৈশিষ্ট্য। এ সকল বৈশিষ্ট্যের জন্যই কি গানটি মনে ধরেছে? হয়তো পুরোপুরি সত্যি নয়। অনেকে ভাবতে পারেন সংস্কৃতির মধ্যে একটা আবদ্ধ করে রাখার প্রবণতা আছে, অসংস্কৃতি সেখানে আমাদের একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচার সুযোগ দেয়। এই যে গানের সাথে এলোপাথাড়ি হাত-পা ছুঁড়ে লম্ফঝম্প করতে পারছি এও এক স্বাধীনতা। তবে, বাউল-ফকিরের লালনগীতি, চৈতন্য মহাপ্রভুর গানেও তো ভাবে নিমজ্জিত ও আত্মহারা হয়ে দু-হাত তুলে নাচ করার নিদর্শন দেখা যায়। সব ভুলে গানে একাত্ম হওয়ার উদাহরণ হিসেবে মাচা গান নিশ্চয়ই একচ্ছত্র সম্রাট নয়। তারও প্রতিদ্বন্দ্বী আছে, পূর্বসূরী আছে।
আসল কারণে আসি। কমার্শিয়াল ছ্যাঁচড়ামোর মাঝেও টুম্পা অতি সহজ-সরল ভাষায় অত্যন্ত ছাপোষা, মধ্যবিত্ত, ও স্বাভাবিক কিছু ইচ্ছের কথা খুব কনফিডেন্টলি বলে দেয়। কোনো বেয়াড়া, বেহিসেবী বোলচাল সেখানে নেই। নেই কোনো গগনচুম্বী অ্যাসপিরেশন। প্রেমিকের বক্তব্য: চাঁদনী রাতে তিনি টুম্পার সাথে যাবেন “ডিনার ডেটে পোচ-মামলেট খেতে”, “কোনো মধুর রাতে” তিনি “টুম্পার সাথে” বসে বাদাম খাবেন তার “টালির ছাদে”। ব্যাস। খুব সাদামাটা জীবনই এখানে মাইলস্টোন। টুম্পা প্রেমের ব্যালাড হিসেবে কালজয়ী না হলেও, এক নিম্নমধ্যবিত্ত প্রেমের পাঁচালী হিসেবে হয়তো পাশ করে যাবে। বাংলাদেশি শিল্পী সুমি শবনমের গানের কিছু কথা মাথায় আসছে: “তোর গোলাপ গোলাপ ঠোঁটে যখন বিড়ির ধোঁওয়া ওঠে, সেই ধোঁওয়া দেখিতে বড়ই ভাল্লাগে; ছেলে তোর প্রেমে পড়ার কারণ তোর শ্যামলা শ্যামলা বরণ, ওই শ্যামলা গালের কালো দাড়ি ভাল্লাগে।”

এপারে ফিরে এলে পরিচালক রাজ চক্কোত্তির এক সিনেমায় অরিজিৎ সিং-এর না রে না গানটি ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল। “পড়েছি ভালোবাসায়, আর কে আমাকে পায়, আমিও এবার পার্কে বেড়াবো, কখনও বা সিনেমায়! অটোতে বাসেতে সীট, পাশাপাশি হবে ফিট, আমিও এবার রকিং রোমিও, করবো মন যা চায়!” কলেজে এই গানটা প্লেলিস্টে লুপে চলেছে, এখনও মন খারাপ হলে শুনি। সুমি শবনমের গান প্রথম শুনি এক ইংরাজি প্রফেসরের হোয়াটস্যাপ্ স্টেটাসে। দুটো গানেরই কোনো অন্তর্নিহিত মানে নেই, নিতান্তই প্রথম প্রেমে পড়ে নাস্তানাবুদ হওয়ার গল্প। একপ্রকার মাচা গানই বলা যায়। বলা বাহুল্য এর কোনোটাই মাস্টারপিস নয়। বিশাল কোনো আর্টিস্টিক ভ্যালুও নেই। এরকম বহু গান এসছে গেছে, আরও আসবে যাবে।
তবু মাথার মধ্যে একবার সেঁধিয়ে গেলে আর বেরোতে চায় না কেন? কেবলই তালে তালে পা মিলিয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে নাচা যাবে বলে? বোধহয় না। জীবনের সাধারণ বা ছাপোষা চাওয়াকে কোনো ঘষামাজা না করে বলার কায়দাটাই আমাদের মগজে সেঁধিয়ে যায়। ভাববেন না সাধারণত্বকে ‘mediocre’ বলে খাটো করছি। বরং উল্টোটা। The ordinary and the uncouth becomes inspiring enough to merit a cause for celebration. And it is that happiness which becomes radical, even if the art from which it is sourced cannot aspire to such greatness. Because, maybe, it doesn’t need to. যে ‘আর্ট’ প্রকৃতই ছ্যাঁচড়া সে কি আর মহানুভবতা নিয়ে মাথা ঘামাবে? তার কিসের দরকার উচ্চস্থানের? সে তো অলরেডি পপুলার।
শেষ করি একটি অভিজ্ঞতা দিয়ে। সিনেমা হল্ থেকে বেরিয়ে আমি ও আমার বন্ধু ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির জল মেশানো লেবু চা সাঁটাচ্ছি, এমন সময় এক ছোকরা গোছের লোক (বলছি ছোকরা, কিন্তু পর্যবেক্ষণে বোঝা যায় মধ্যবয়স পার করে ফেলেছেন) ছাতা মাথায় একগুচ্ছ ড্রয়িং পেপার ও একটা কাঠের ক্লিপবোর্ডে সহযোগে আমাদের সামনে উদয় হলেন। ময়লা সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। পিঠে ব্যাগ। উদিত হয়েই স্তাব চালু। ওঃ দিদি আপনাদের তো হ্যেব্বি লাগচে, চশমাখান যা এঁটেছেন এক্কেরে রেখা, দেকেই মনে হচ্চে একটা ব্যাপার – ইত্যাদি ছাইপাঁশ, যা কোনো ছেলেও আজ পর্যন্ত লাইন মারার অভিপ্রায়ে বলে নি। আমার আর বন্ধুর তখন গরম চায়ে জিভ পুড়ে গেছে, প্যাচপ্যাচে আধাভেজা অবস্থাতে কাঁধে ছাতা ও ব্যাগের লটরপটর সামলাতে সামলাতেই কমপ্লিমেন্টের রানিং কমেন্ট্রি চলতে থাকে। তখনও পুরোপুরি সন্ত্রস্ত হইনি, আর ওইটিই হলো কাল। পরে বুঝেছিলাম এও এক ক্রিয়েটিভ রণনীতি। Isolate and bombard with praise so wild you’re hooked. ভরদুপুরে নন্দন চত্বরে কোন সৌন্দর্যবিশারদ মহিলাদের ঘর্মাক্ত রূপের প্রকাশ্যে তর্জমা করে রে ভাই?
মহোদয় আর্টিস্ট। প্রতি ছবি পিছু রেট ৫০০ টাকা। কিন্তু কোনো রহস্যময় কারণে আমাদের যৌথ রূপে আপ্লুত হয়ে গিয়ে তিনি রেটটি ধাঁ করে কমিয়ে ১০০ টাকায় এনে ফেললেন। ততক্ষনে কলম চলতে শুরু করেছে। আমার বন্ধুটি যাকে বলে যন্তর পিস। চোখের ইশারায় যত বলি ‘সরে পড়, সরে পড়’, সে বিস্বাদ নোনতা চায়ে চুমুক দিয়ে আরো পোজ মেরে দাঁড়ায়। হয়তো পরিচালক মৈনাক ভৌমিকের কাজ দেখে তার মনে হয়েছিলো জীবনে আরেকটু দুঃসাহসিক হতে হবে, ঝুঁকি নিতে হবে। ল্যাজ মোচড়ানো ষাঁড়ের মতো আমি তখন ফুঁসছি। কিন্তু সে ক্রোধে ছুঁচোও মরে না। কতক্ষন সময় পেরিয়েছে জানি না। বাজপড়া কাকের মতো থোবড়া নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে। ভদ্দরলোক বলছেন, ‘হাসুন’। মনে হচ্ছে থাবড়াই। বন্ধু বেশ ফুরফুরে মেজাজে। অবশেষে চিত্র অঙ্কন শেষ হলো।
শিল্পশেষে যে অভূতপূর্ব পরাবাস্তব স্মারকটি তিনি আমাদের হাতে প্রেরণ করলেন, তাকে ভাষায় প্রকাশ করার সাহস আমার অন্তত নেই। পাঠক বিচক্ষণ ব্যক্তি, নিজে অনুধাবন করে নেবেন। বন্ধু বললো, ‘ভাই, ক্যাশ তো নেই, তোকেই দিতে হবে।’ একবার ভাবলাম পরাভূত হয়ে বলি, ‘দাদা, দরকার নেই, আপনার কাছেই রেখে দিন।’ বন্ধু বলে, ‘ক্ষেপেছিস! এ ছবি দলিল।’ কড়কড়ে কমলা দুশো টাকার নোট বিলক্ষণ সাক্ষী যে জঘন্যতম আর্টেরও মূল্য আছে। Encountering the worst artistic vision comes at a price, literally. তাই তাকে হ্যাটা করা উচিত নয়।
ছবিটি আমার বন্ধুর ট্রেজারিতে গচ্ছিত। নিচে দেওয়া আছে, আপনারা দেখে নেবেন। পাশাপাশি সেইদিনই তোলা আরেকটি ছবিও দেওয়া রইল। Images shown are for representational purposes only. The choice of judgment belongs solely to the viewer.


An English translation of the essay will be available later.
অনুজা দত্ত বর্তমানে বাংলায় আধিভৌতিক ও অলৌকিক রসের সাহিত্য নিয়ে গবেষণারত। তার চর্চার মূল বিষয় বিংশ ও উনবিংশ শতাব্দী জুড়ে গড়ে ওঠা অলৌকিকে পরিবেশের পরিকাঠামো ও বস্তুবাদ।
Anuja Dutta is an independent research scholar specializing in the nexus of horror, ecology and space and how they feature in the colonial and postcolonial studies of land in vernacular literature.
